জন্মদিনাভিনন্দন

68

ব্লগের জনপ্রিয় লেখক ও কবি, মহায়ুন আহম্মদ তার নিজস্ব ব্লগপোস্টে লিখছেন-

আজ ছিল আমার ত্রিশতম জন্মদিন। জীবনের নতুন আরেকটি বর্ষের পয়লা দিনে আমার তনুমনে উথলে উঠছিল এক নতুন রকমে অনুভূতি। আমি নাস্তায় বসলাম। সামনে ছিল আমার প্রিয়তমা সুন্দরী, সুকেশা, সুহাসিনী, পরম আদরণীয়া স্ত্রী। আমি তারকাছে জন্মদিনের শুভেচ্ছাবাণী প্রত্যাশা করছিলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে তার মুখটা নিশাচারিণী কদর্য হুতোম প্যাঁচার মত বানিয়ে রাখলো সারাটাক্ষণ।

শুভেচ্ছাবাণী দূরে থাক, আমার সাথে সে মিষ্টি করে একটিবারের জন্য কথাও বললো না।

আমি নিজেকে প্রবোধ দিলাম এই বলে, ‘হে কামিনে কামিনী, তুমি হয়তো ভুলে গেছ তোমার সুহৃদের জন্মতিথি। কিন্তু আমাদের সন্তানেরা সেটা নিশ্চয়ই ভুলেনি।’ কিন্তু আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার পাশে বসে থাকা দুই সন্তানের কেউই আমাকে জন্মদিনের শুভাগমনী বার্তা শোনালো না। ‘কীভাবে পারলো তারা তাদের পিতার ধরাগমন দিবস বিস্মৃত হতে।’, ভাবলাম আমি।

ভগ্ন মনোরথে আমি চললাম অফিসের পানে। অফিসে যখন আমি বসে আছি, আর অবচেতনে নিজের দুর্ভাগ্যকে অভিসম্পাত করে চলেছি, এমন সময় প্রবেশ করলো আমার সুন্দরী সেক্রেটারি শর্মিলী। ঠোঁটের কোণে একটা মনোহর হাসি খেলিয়ে, কিন্নরের সুরে সে আমায় বলল, “শুভ জন্মদিন, স্যার।”

হঠাৎ আমার মনে হলো- আমি আছি। আমার প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এই মিষ্টি কোমল মেয়েটা আমার কাছে আমাকে যেন প্রয়োজনীয় করে তুললো আরেকবার। আমি কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলাম।

আমি দুপুর অবধি কাজ করলাম। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো। নীল পাড়ের শাড়ি পরিহিতা শর্মিলী পুনঃপ্রবেশ করলো আমার কক্ষে। আমাকে স্নেহার্দ্র স্বরে বললো, “কী চমৎকার আজকের দিনটা। তার ওপর আপনার জন্মদিন। চলুন না স্যার, দুজন মিলে আজ বাইরে থেকে ডিনার করে আসি।”

আমার চিত্ত উদ্বেলিত হলো। আমি বললাম, “এটাই সম্ভবত সুন্দরতম বাক্য, যা আমি আজকে শুনলাম।” বলেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমি শর্মিলীর সাথে লাঞ্চে গেলাম। অনেক মনোলোভা কথোপকথোনে, অনেক মধুর শব্দের মায়াপ্রপঞ্চে জড়িয়ে আমরা ভোজপর্ব শেষ করলাম।

ফেরার পথে শর্মিলী আবদার করে বসলো একটু অন্যরকম। পুনরায় স্নেহার্দ্র বচনে সে বললো, “দেখুন স্যার, আজকের দিনটা এত্ত সুন্দর। কী দরকার বাকি সময়টা অফিসে একঘেঁয়ে কাজ করে নষ্ট করার। চলুন আমার অ্যাপার্টমেন্টে যাই। আজকের এই আলো ঝলমলে বিকেলটা খুব ভালো কাটবে।”

তার স্বরের প্রচ্ছন্ন মাদকতা আর আবেদনে আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না। আমার প্রতি তার ভালবাসায় আমি মনে মনে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলাম তার প্রতি। আমি রাজি গেলাম মুহুর্তেই।

তার ঘরে বিরাজ করছিলো এক অন্যরকম থমথমে পরিবেশ। কক্ষপূর্ণ সর্বসংহারী নৈশব্দ আর ছাই রঙা আঁধারকে চিরে একাকিনী নিসর্গকে রাঙিয়ে দিচ্ছিল ডিম লাইটের একচিলতে নীলাভ আলো। আমি সেই অনুর্বর আলোতে একবার দেখে নিলাম সেই নারীমূর্তিকে।

চুরি যাওয়া সে আলো তার শরীরের সব রমণীয় বক্রতার উপর ক্ষীণ কলেবরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। আলোকের নীলিমা, আঁধারের কৃষ্ণতা আর বদ্ধ বায়ুর মন্দ উষ্ণতা মিলেমিশে আমার সামনে তৈরী করে নিয়েছিল এক সাক্ষাৎ দেবীমূর্তি। হয়তো ভেনাস, নয়তো বাসতেত, নয়তো বিষ্ণু পুরাণের কোন এক কামদেবী।

হঠাৎ নৈশব্দ ভেদ করে আমি শুনতে পাই, “স্যার, আপনি এখানে আরাম করে বসুন। আমি পাশের রুম থেকে কাপড় চোপড়ের ভার নামিয়ে আসি।….কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসব। আর এসেই….” আমি শুনতে পেলাম প্রগাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ।

মুখজ শব্দগুলো কামনাসংকুল দীর্ঘশ্বাসে ধুয়ে ধুয়ে যাচ্ছিল যেন। “…এসেই আপনাকে চমকে দেব স্যার, যা আপনি বাকি জীবনে কখনও ভুলতে পারবেন না।” সেই কণ্ঠে যেন লিপ্সার হলাহল ক্ষরে ক্ষরে ঝরে পড়ছিল। আমার শরীর ভীষণ রকমে জেগে উঠলো। সাথে আমি হয়ে উঠলাম প্রতিশোধ পরায়ণ। আমার স্ত্রীর প্রতি। যার কাছে কিনা আমার কিঞ্চিৎ মূল্য নেই, আমার এই জন্মদিনটুকুও মনে রাখার বালাই নেই। আমার ডান হাত চলে গেলো নিজের শার্টের প্রথম বোতামটায়।

আমি দেখলাম শর্মিলীর ছায়ামূর্তি কটিদেশ দুলিয়ে, নিতম্বে গঙ্গোর্মি খেলিয়ে, চপল চরণে দূরে সরে যাচ্ছে। পাশের কক্ষ থেকে আসা চাপা আলোতে তার শারিরীক সৌষ্ঠব সুবিকশিত হয়ে উঠছে। শেষবার ঝলক দেখিয়ে সে মূর্তি মিলিয়ে গেল অদৃশ্য নিরালায়।

কিছুপর দেখি হঠাৎ ভীষন তেজের কয়েকটা বাল্ব জ্বলে উঠলো, প্রায় জ্বালিয়ে দিল আমার চোখকে। আমি শুনলাম দূর থেকে ভেসে আসছে সুরেলা শব্দরোল, “শুভ জন্মদিন, শুভ জন্মদিন তোমার।” দেখলাম শর্মিলী একটা ঢাউস সাইজের কেক নিয়ে রুমে ঢুকলো। তার পেছন পেছন ঢুকলো আমার স্ত্রী, আমার দুই বাচ্চা, এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের নম্রতা ভাবিও।

অথচ তখন নরম গদির উপর শরীর এলিয়ে একাকী বসেছিলাম আমি……..আপাদমস্তক উলঙ্গ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here