নীলাম্বু ( পর্ব ১ )

105

মারিয়েন ফয়সাল

গতকাল নীলাম্বু এসেছিল। অনেক, অনেক দিন পর।কত বছর হবে? নাকি যুগ? বোধহয় আড়াই যুগ; আর আমি অনুভব করলাম সেই উথাল -পাথাল ঢেউ! অনুভূতিগুলো কখনই বদলায় না।

-বদলেছো নাকি?

-বদলানোই তো স্বাভাবিক। তোমার কি মনে হয়?

-না, তোমার চোখ বলছে -বদলাওনি।

-তোমার তীক্ষ দৃষ্টির প্রশংসা করতে হয়!

এর থেকে বেশি কিছু বলার উপায় ছিল না আমার! সৌখিন পন্যের একটা দোকান চালাই আমি।
-এরকম একটা ছোট পরিবেশে আশা করিনি তোমাকে।

বুঝলাম অপর পক্ষও বিন্দুমাত্র বদলায়নি।কৌতুক! রাগানোর চেষ্টা! সেই পুরোনো প্রিয় খেলা।
উত্তর দেয়ার সুযোগ হয়নি। আমার মহিলা খদ্দেরদের কান বড়ই সজাগ।

বাসায় ফিরে সোজা মায়ের ঘরে গেলাম।

– অনেক দিন পর দেখা হল।

স্বীকারক্তির মত শোনাল।

ফিরে চলে আসছিলাম, শত চেষ্টা করেও একবার পিছন ফিরে তাকানোর সহজাত প্রবৃত্তিটাকে এড়াতে পারলাম না।ফিরে তাকালাম, মায়ের প্রগাঢ় ভালবাসা মেশানো চোখের নীলাভ দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ল আমার মুখে, অন্তঃস্থল ভেদ করে যেন ওপারে পৌঁছালো, অথবা আরও অনেক দূরে।

হঠাৎ চোখ পড়ল মায়ের স্কেচ বুকটাতে। চারকোল দিয়ে আউটলাইন তৈরী করা হয়েছে মাত্র। একদম সামনে কোমরে সোয়েটার জড়ানো আমি, অনেক পেছনে একটু ঘাড় ফেরানো নীলাম্বু।

মনে পড়ল ছবিটা তোলার সময় মা ‘নীলাম্বু…’ বলে ডেকেছিলেন । নীলাম্বুর পেছনে প্যালেসটা। মায়েরই তোলা ছবি। ওটারই চারকোল স্কেচ করতে বসেছেন।

-ওহ! তুমি জানতে তাহলে!

নীলা মাও এসেছেন নিশ্চয়?

-দু’দিন আগে।

‘তোমার কূটনীতির কাছে আমি দুগ্ধপোষ্য শিশু!’ গরগর করে উঠলাম আমি।

-এমনিতেও তুমি আমার কাছে শিশু। শোনো, আমি তোমাদের দু’জনকেই ভালবাসি।

-দু’যুগের উপর পার হয়ে গিয়েছে মা!

-যুগের হিসেব যদি ছয় বছরে হয়, তবে দুই কেন, তিন যুগ হবে!

কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরের

দিকে পা বাড়ালাম ।আসলে, নিজেকে লুকাতে চাইলাম।

ওয়াটারহুইলের মত শোঁ শোঁ করে পানি টেনে তৃষ্ণা মেটানোর ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠছে। বলা যায়, সত্তুরের ওই অভিগ্গ দৃষ্টির সামনে থেকে পালিয়ে এলাম।

নিজের ঘরে ফিরে এসেছি। । আবারও অনুভব করছি ঢেউ এর প্রবল ধাক্কা, ঠিক সেই আগের মত; বুকের ভেতর একটা ‘ধকধকে’ অনুভূতি। বছরে পর বছর ধরে গড়ে তোলা অদৃশ্য ক্লিফটা নুড়ি পাথরের মত ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে । চওড়া ফাটলের ফাঁক গলে ঢুকে পড়া ঢেউ , ছত্রাকে ঢাকা অন্তরটাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছে।

লাইলাক রঙা একটা শাপলা. আবারও পাপড়ি মেলতে শুরু করেছে। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনুভব করছি নীলাম্বুকে আর একটিবার দেখার প্রবল ইচ্ছা। আমি জানি, এই ‘একটিবার ‘ দশ হাজার বার দেখার ইচ্ছায় পরিণত হবে।

সামান্য নিকেলের সিকিটাও মুঠো খুলে ফেলে দিয়েছিলাম, আর এখন গোটা টাকাটাই ফেরত পেতে চাইছি। আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি দু’সারি শালবনের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা চিকণ পথের ঠিক মাথায়, আর শালপাতার ফাঁক গলে ঝিকিয়ে ওঠা রূপালি আলোয় দেখতে পাচ্ছি আমার বহু পুরোনো বাক্স বন্দী স্মৃতিগুলো বাক্স গলে বেরিয়ে পড়েছে; একের পর এক আমার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে স্লাইড শোয়ের মত। ওদের দোষ কি, আমি নিজেই তালাটা খুলে ফেলেছি!

নিজেকে ধিক্কার দিলে ইচ্ছে করছে, কিন্তু তারপরও কি নীলাম্বুকে দেখার ইচ্ছেটাকে দমন করতে পারছি!
আমি জানি ও আগামিকাল আবারও আসবে । আসবেইI আর এতে কোনো সন্দেহ নেই। অবচেতন মনের আনন্দ আর চেতনের পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে অপেক্ষা করছি সকালের – দোকান খোলার সময়ের।(চলবে )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here