জীবনের বাঁকে : (পর্ব ১) :

145

নীরা দুঘণ্টা চুপচাপ বসে আছে।তবে এই দুঘণ্টা তার কাছে প্রায় দুবছরের মতো দীর্ঘ লাগছে।মেকাপ রুমে শুধু সে আর,মেকাপম্যান সিরাজ।দু-তিনটে মশা অত্যধিক জ্বালাতন করছে তাকে।নীরা শাড়ির আঁচল দিয়ে মশাগুলোকে তাড়ালো।সিরাজ একটু হেসে নীরার দিকে তাকালো।

-খুব মশা, নীরা !

নীরার বিরক্ত লাগছিলো।মশা নয়তো কি হাতি! এই কুমড়োপটাস, তোকে মশা কামড়ায় না কেন রে!! যদিও এসব কিছুই সে সিরাজকে বললো না ; শুধু একটু হাসলো।

আজ নাকি খুব সকালেই শুটিং শুরু হবার কথা।অথচ নায়িকার কোন দেখা নেই।উপায় না দেখে নীরা সিরাজকে বললো,

– সিরাজ ভাই, আপনি আমার মেকাপটা করে দেন। সবাই তো মোটামুটি চলে আসছে।এখন মনি আপু এলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে।

– আরে !! শোন বোনটি, তোমার মেকাপে আমার বেশি সময় লাগবে না।মনি ম্যাডাম আসুক আগে।তুমি এক কাজ করো, তোমার ডায়লগে একবার চোখ বুলিয়ে নাও এই সু্যোগে।

নায়িকার বান্ধবীর ভূমিকায় ছোট একটা চরিত্রে কাজ করছে নীরা এখানে।

সিরাজ দু-চার মিনিট এদিক-ওদিক পায়চারি করে আবার নীরার পাশের চেয়ারটাতে বসলো।

– চা খাবে তো ? দুকাপ চা দিতে বলেছি এখানে।

-হুম।

– বোনটি, যদি কিছু মনে না করো তোমাকে কিছু কথা বলি।অবশ্য কথাগুলো তোমার ভালো জন্যই বলছি।ভাল কাজ করবার ইচ্ছা থাকলে তোমার বেশভূষার কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে।

– কেমন পরিবর্তন ?

সিরাজ চায়ের কাপে একবার চুমুক দিলো।তারপর এক পিস কেক নিয়ে চায়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খেতে লাগলো।
– এই ধরো, তুমি প্রতিদিন শাড়ি পরে সেটে আসো। তোমার বয়সী কোন মেয়ে এখন কি শাড়ি পরে ?

আবার চুলে বেনী করে রাখো।তোমার মুখে একটা অন্যরকম লাবণ্য আছে, আমি দেখেছি। কিন্ত তাতে কি ! তোমার বিচিত্র সাজসজ্জার কারণে তা কারো নজরে পরে না।

নীরার চোখে বিস্ময়ের দৃষ্টি।

– অবাক হবার কিছু নেই, নীরা।পেশাগত কারণেই তোমার এই বিষয়গুলো আমার অনেকবারই নজরে পড়েছে।তুমি কি বুঝতে পেরেছো, আমি এতকিছু কেন বললাম ?

নীরার লাজুক ভঙ্গিতে উত্তর,

– জি, বুঝতে পেরেছি।

কিছুক্ষণ পরেই নাটকের মূল চরিত্র অর্থ্যাৎ , নায়কের আর্বিভাব হলো।

– এই যে দাদা ,তাড়াতাড়ি আমার মেকাপটা করে দিন।আজ কিন্ত বেশি সময় দিতে পারবো না এখানে।

– কিন্ত প্রবালদা আজ তো আপনার আসবার কথা ছিল না, যতটুকু আমি জানি।

– হা ছিল না।মনি আজ আসতে পারছে না।তাই ওই স্ক্রিপ্টগুলোতে আজ কাজ হচ্ছে না।

একথা শুনে বেচারি নীরা নিরাশ হয়ে গেল।অর্থ্যাৎ , তারও আজ কোন কাজ হবে না।

অনেকেরই নায়িকা হবার স্বপ্ন থাকলেও , নীরার মাঝে তেমন একটা নেই।তবে এতে করে যদি তার উর্পাজনটা বৃদ্ধি পায়,তাহলে তা ভালই হতো নিঃসন্দেহে।নীরার খুব ইচ্ছে করে, মায়ের সেই হাসিমাখা মুখখানি আবারও দেখতে ! বাবা মারা যাবার পর মাকে শেষ কবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখেছিলো সে, মনে পড়ছে না।আর তারপর, ইচ্ছা থাকা সও্বেও লেখাপড়াটা আর এগুতে পারলো না।নীরা তার খালাতো বোন ঝিলিকের মাধ্যমেই অভিনয়ের সু্যোগ পেয়েছে।যদিও ঝিলিক এখন অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি সংসারী ; তবে সেই জগতের সবার সাথে তার যতটা সম্পর্ক ছিল, আজও তা অপরিবর্তনীয়।

অপরদিকে নীরা ঝিলিকের সম্পূর্ণ বিপরীত।কর্মক্ষেত্রের এই রঙিন ভুবন আর, বর্ণিল তারাদের জীবনযাপন কোনটাই তাকে তেমনভাবে আকর্ষণ করে না।জীবনের তাগিদে তাকে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে।তাছাড়া ,সে নিজেও একটা চাকরির জন্য কম চেষ্টা করেনি।

সেই সাথে, প্রতিদিন সকালে বাড়িওয়ালার ভাড়া আদায়ের গলাবাজিতে জীবনটাও যেন হয়ে উঠেছিলো দুর্বিষহ। এই সময়টায় একমাত্র ঝিলিকই নীরাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।যদিও ঝিলিকের অতিরিক্ত উপদেশ দেবার স্বভাবটা নীরার একদমই পছন্দ নয়, তবে বোন হিসেবে ঝিলিকের কোন তুলনা হয় না।

ঝিলিক প্রায়ই নীরাকে বলে,

– এভাবেই কাজের সাথে লেগে থাক মন- প্রাণ দিয়ে।দেখবি, একদিন নায়িকার চরিত্রে কাজ করবার সুযোগ পেয়ে গেছিস।

নীরার নির্লিপ্ত জবাব,

– আচ্ছা।

– সব কথায় এত আচ্ছা আচ্ছা করবি না।আর সবসময় হাসিখুশী থাকবি। জগতের সব উদাসীনতা যেন তোর মুখটা ছেয়ে থাকে। এমন হলে তো চলবে না নীরা !

– হাসি না আসলে কি জোর করে হাসবো ??

– এগুলো কি কথা নীরা !

(চলবে …..)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here