আমার আকাশে শুধুই তুমি : (পর্ব -১)

128

–জিনিয়া জেনিস

আজ আকাশটা নীল, আর মেঘেরা সবাই ছুটিতে।শুধু নীল নয় স্বর্গীয় এক শান্ত মায়া ছেয়ে আছে পুরো আকাশটা জুড়ে।রোদের তেজ নেই, আছে শুধু একটা স্নিগ্ধ আমেজ।অন্যদিনের মতো সোনুর ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো না। ছুটির দিনের এই সুখ টুকুন থেকে সে আজ বঞ্চিত হলো ! আর কিছু না।তারপর নরম ঘাসের মাঝে হাত – পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে অনেকটা সময় জুড়ে।

নাহ্ , কোন পার্কে কিংবা মাঠে নয় ; সোনুদের গ্রীনরুফে।ছাদটিতে প্রবেশের সাথে সাথে সবুজের মায়া যে কোন মানুষের মনকে প্রশান্ত করে দেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।নরম ঘাসগুলোর ওপর রুদ্রিকা যেদিন প্রথম পদচিহ্ন রেখেছিলো, সেদিনটার কথা আজও মনে আছে সোনুর।

সবুজ ঘাসগুলো খুব আলতোভাবে আদর মেখে দিয়েছিলো রুদ্রিকার দুটো পায়ে।পাঁচ-ছ বছরের বাচ্চাদের মতো খুব ছোটাছুটি করেছিলো সেদিন।একটু পরপর দু-তিন বার সোনুকে একই কথা বলছিলো।

– জানো,আমি এমন ছাদ বাস্তবে এই প্রথম দেখছি।

সোনু কিছু বলেনি, শুধু একদৃষ্টিতে রুদ্রিকার চোখের মুগ্ধতাকে দেখছিলো।ছাদের একপাশে বেলী,সাদাগোলাপ আর হাসনাহেনা গাছ লাগানো।সোনুর বাবা আনিস আহমেদ সাদা ফুল খুব ভালবাসেন।তাই বাগানে অন্য কোন রঙের ফুলের উপস্হিতি নেই।যদিও সোনুর মা সোফিয়া আহমেদ চেয়েছিলেন ছাদে কিছু ফল আর সবজির গাছ লাগাতে, কিন্ত সোনু এবং তার বাবার সায় না থাকাতে তিনি আর এগোতে পারলেন না !

আর, ছাদের অপর পাশটায় রয়েছে তিন -চারটা বেতের চেয়ারের সন্নিবেশে একটা সুন্দর টি-টেবিল এবং একটি দোলনা।অর্থ্যাৎ , আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের সাথে কিছু সুন্দর সময় কাটানোর সকল সুব্যবস্থা এখানে নিঃসন্দেহে বিদ্যমান।সোনুর বাবা এবং মা দুজনেই পেশায় আর্কিটেক্ট।

সে সুবাদে সোনু এবং তার বন্ধুরা আনিস সাহেব এবং সোফিয়ার কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে।লেখাপড়া শেষ করে সোনুর বাবার অফিসে জয়েন করবার একদমই ইচ্ছে ছিলো না।যদিও সোফিয়া আহমেদের ইচ্ছে ছিলো ছেলেটা নিজেদের অফিসেই থাকুক।তবে, আনিস সাহেব সোনুকে কোন জোরাজোরি করেন নি।কারণ,তিনি ভাল করেই জানতেন সোনু শেষমেশ এখানেই ফিরে আসবে।

সোনুর বেখেয়ালি স্বভাবটা কাজের মাঝে বেশ কয়েকবারই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।সে ব্যাপারটা অবশ্য সে নিজেও উপলদ্ধি করতে পেরেছিলো।তাই নিজ থেকেই দুবার চাকরি বদল করলো।তবে কোন এক অজানা কারণে হয়ত কাজ কিংবা পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলো না একদম।

যদিও পুরুষ মানুষের বেলায় আমরা ভাবি, এসব বিষয়গুলো বড্ড বেমানান।সঙ্গত কারণেই হয়ত সোনু কাউকে কিছু না জানিয়েই আবারো চাকরি থেকে অব্যাহতি নিলো।এরপর এক মাস বিরতির পর সোনু তার বাবার অফিসে এসে, সোফিয়া আহমেদকেও কিছুটা চিন্তা মুক্ত করলো।

দুদিন হলো রুদ্রিকা তার মা লাবণ্য হামিদের সাথে কোলকাতা গেছে।রুদ্রিকার নানু খুব অসুস্থ। তিনি বারবার নাতনীর কথা বলছিলেন।রুদ্রিকার মামা স্বপরিবারে কোলকাতা থাকেন।আর, রুদ্রিকার নানুও দু-বছর ধরে ওনার কাছেই আছেন।

সোনুও ওদের সাথে যেতে চেয়েছিলো তবে,শাশুড়ি লাবণ্য হামিদের আকাশ পথে যাত্রায় ভীতি দেখে ; সোনুর আর ওদের সাথে যাওয়া হলো না এবার।স্থলপথের দীর্ঘ যাত্রা ! ওসব ঝামেলার কথা ভেবে সে আর কথা বাড়ায় নি।রুদ্রিকা অবশ্য ব্যাপারটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলো।

তাই সে নিজেই মাকে বললো,

– খামোখা সোনুকে নিয়ে কেন টানা-হ্যাঁচড়া করছো মা! গত মাসে ওকে ছুটি নিতে হয়েছিলো।কেন তোমার মনে নেই ? তাই এখন হয়ত সম্ভব হবে না।

এই দুদিন একদম ভাল যাচ্ছে না সোনুর।মনে হচ্ছে, কাঁধে নতুন এক রোগ ভর করেছে।যার নাম হচ্ছে – ভাল না লাগা রোগ।প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এর উদ্ভব ঘটে এবং অফিস থেকে ফেরার পর এই পীড়ার মাত্রা কিছুটা হলেও বেড়ে যায়।

যদিও সোনুর আগে এমনটা হতো না ! গিটারে সৃষ্ট সুরের উন্মত্তায় এককী সময়গুলোও কেটে যেত বস্ত্যতায়।অথবা, বন্ধুদের আড্ডায় কখন যে সাত কাপ চা নিমিষেই শেষ হতো ; তার খবর সে নিজেও রাখতো না।তবে, এখন রুদ্রিকার আকাশে নিজেকে বন্দী করে রাখতেই সে ভালবাসে।

আকাশটাকে দেখতে দেখতে সোনু রুদ্রিকার কথাই ভাবছিলো।তাদের প্রথম দেখা হবার সেই দিনটির কথা।এক ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেও সোনুর রুদ্রিকার সাথে পরিচয় ছিল না।হয়ত ডিপার্টমেন্ট এক না হবার কারণে।একবার ভার্সিটির অনুষ্ঠানে ছোট একটি নাটিকায় রুদ্রিকা আর,তার বন্ধু রেদওয়ান অংশ নেবার কথা ঠিক হলো।

তবে অনুষ্ঠানে আগের দিন রেদওয়ান সব বেমালুম ভুলে, ঘুরতে গেল তার দাদা বাড়ি সিলেটে।এদিকে গত দুদিনে রেদওয়ানকে ক্যাম্পাসে না পেয়ে রুদ্রিকা ওকে ফোন করলো।অনুষ্ঠান শুরুর আর মাত্র দুঘণ্টা বাকি।তবে রেদওয়ানের কথা শুনে সে রীতিমত আঁতকে উঠলো।

এসময়ে রুদ্রিকার দুই বান্ধবী রাত্রি এবং স্বপ্না ওকে শান্ত করালো এই বলে যে, তারা ভার্সিটির কোন সহপাঠী বা ছোট ভাইকে রাজি করিয়ে যেভাবেই হোক নিয়ে আসবে।তাছাড়া নাটিকায় রেদওয়ানের ডায়ালগ তুলনামূলক ভাবে কম।তাই নতুন কেউ এই মুর্হূতে রাজি হলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।বান্ধবীদের আশ্বাস পাওয়ার পরও রুদ্রিকাকে কিছুটা বিচলিত দেখাচ্ছিলো।

সোনু সেদিন ক্লাস শেষে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলার পর বেশ ক্লান্ত ছিলো।তবে রাত্রি তার পূর্ব পরিচিত হওয়ার কারণে সহজেই ওদের এড়াতে পারছিলো না সোনু।ড্রেসিং রুমে নীল জামদানিতে সোনু রুদ্রিকাকে প্রথম দেখলো।দুহাত ভর্তি লাল চুড়ি।

চোখের কাজলটা একটু লেপ্টে গেছে বোধহয়।কিন্ত, তাতে আরো বেশী মোহনীয় লাগছিলো তাকে সোনুর দৃষ্টিতে।এর চাইতে অনেক রূপসীও সোনুর জীবনে একসময়ে আসতে চেয়েছিলো।যদিও, সোনু বরাবরই ওসব থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে।

তবে কেন রুদ্রিকাকে দেখার পর এক অজানা উৎকন্ঠা তার মনের দুয়ারে এভাবে কড়া নাড়লো !
যদিও রুদ্রিকার সেটা বোঝার কথা নয়।কারণ, তার চোখজোড়ায় উদ্বিগ্নতা সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান।রাত্রি আর স্বপ্নাকে দেখেই রুদ্রিকার জিজ্ঞাসু চোখে প্রশ্ন,

– কি , কিছু হলো ?

– হ্যা , সোনুভাই করবে বলেছে। তাড়াতাড়ি স্ক্রিপ্টগুলো দে ওনাকে।

রুদ্রিকা এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে অস্হিরতায় দুটো গ্লাস ভাঙ্গলো। অবশেষে স্বপ্নাই সোনুকে সবকিছু বুঝিয়ে দিলো।রুদ্রিকার চুড়িগুলোর দিকে এবার রাত্রির নজর পড়লো।

– কিরে নীল শাড়ির সাথে লাল চুড়ি কেন ?

– তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে চুড়িগুলোও ভেঙ্গে ফেলেছি।তারপর তোর ব্যাগে লাল চুড়িগুলো পেয়ে তা-ই পড়ে নিলাম।

– উফফ ! বাদ দে, যা হবার হয়েছে।এখন একটু শান্ত হয়ে বোস।সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

রাত্রি কথাটা শেষ না করতেই রুদ্রিকা আর স্বপ্না দেখলো, সোনুর শার্টটা বেশ নোংরা। কিছুটা কাদাও লেগে আছে।স্বপ্না কিছু বলার আগেই রুদ্রিকা নিজের শার্টটা সোনুর দিকে এগিয়ে দিলো।

– এটা পরে নাও, তোমারটা তো একদম নোংরা।

রুদ্রিকার মুখে প্রথম সাক্ষাতেই তুমি সম্বোধন, সোনুর মনকে উদ্বেলিত করে দিলো।যদিও, কারণটা জানা থাকলে হয়ত তার উল্টোটাই হতো।

(…..চলবে )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here